দুর্গম ফ্রেশবাজারে তিন শতাধিক পাহাড়িকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিল সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন

দুর্গম ফ্রেশবাজারে তিন শতাধিক পাহাড়িকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিল সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন

দুর্গম ফ্রেশবাজারে তিন শতাধিক পাহাড়িকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিল সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালার দুর্গম ফ্রেশবাজার এলাকায় অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত তিন শতাধিক পাহাড়ি নারী, পুরুষ ও শিশুকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতার মধ্যে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসক ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ায় এ কার্যক্রমকে স্বস্তির উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দীঘিনালা জোন অধিনায়কের নির্দেশনায় দুর্গম ফ্রেশবাজার এলাকায় এ চিকিৎসা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুসহ তিন শতাধিক মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক সময় যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না থাকায় সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রেও মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের সদস্যদের জন্য দূরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া অনেক সময় ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণের এ উদ্যোগ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য সরাসরি উপকার বয়ে আনছে।

দীঘিনালা জোনের আরএমও ক্যাপ্টেন মো. শায়খউদ্দীন সাকলাইনের নেতৃত্বে পরিচালিত মেডিকেল টিম দিনব্যাপী রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। চিকিৎসকেরা রোগীদের শারীরিক অবস্থা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করেন। ফলে অর্থের অভাবে যারা চিকিৎসা নিতে সংকটে পড়তেন, তারাও স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ ও ওষুধ পাওয়ার সুযোগ পান।

সম্প্রতি দীঘিনালা জোন থেকে চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুস্মিতা আক্তার ও শাহিনুর বেগম ক্যাম্পে রোগীদের সেবা দেন।

চিকিৎসা কার্যক্রমে শিশু, নারী ও বয়স্কসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ নেন। চিকিৎসকেরা রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিচর্যা ও পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।

দুর্গম ফ্রেশবাজারে তিন শতাধিক পাহাড়িকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিল সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন

এ কর্মসূচির বিশেষ দিক ছিল দীঘিনালা জোনের উদ্যোগে ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব শিক্ষার্থী মেডিকেল টিমকে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। এতে একদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে, অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাও বাস্তব পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, ফ্রেশবাজারের মতো দুর্গম এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সহজ নয়। অসুস্থ হলে অনেককে দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এ যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম এলাকায় এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের কর্মসূচির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো চিকিৎসাসেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। চিকিৎসার জন্য মানুষকে শহর বা উপজেলা সদরে যাওয়ার পরিবর্তে যখন চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যায়, তখন প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়ে। একই সঙ্গে রোগীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয় এবং গুরুতর কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়াই নয়, দুর্গম এলাকার মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোও এ ধরনের কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীঘিনালা জোনের এ উদ্যোগকে স্থানীয়রা মানবিক সহায়তার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের অনেকের পক্ষে অর্থ ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ এবং স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়ার ফলে তারা অন্তত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাচ্ছেন।

মধ্য বানছড়া এলাকার বাসিন্দা স্নেহ রঞ্জন চাকমা (৬০) বলেন, ‘দুর্গম এলাকার আমরা বেশির ভাগ মানুষ অসহায় ও দরিদ্র। আজ এখানে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়ে উপকৃত হলাম।’

স্নেহ রঞ্জন চাকমা আরও বলেন, ‘এই এলাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়াটা কষ্টসাধ্য। আমাদের দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর ডাক্তার এসে চিকিৎসাসেবা ও বিনা মূল্যে ওষুধ দিয়েছেন।’ তিনি সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাহাড়ের দুর্গম জনপদে নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষের পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রেশবাজারের এই চিকিৎসা কর্মসূচিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে এ ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *