বেথেলপাড়ায় ৬ শতাধিক মানুষের পানির সংকট নিরসনে সেনাবাহিনীর ১ লাখ লিটারের ওয়াটার রিজার্ভার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা উপজেলার দুর্গম বেথেলপাড়ায় দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার একটি ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রুমা জোন। শুষ্ক মৌসুমে ৬ শতাধিক পাড়াবাসীর তীব্র পানি সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে নির্মিত এই জলাধারটি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বেথেলপাড়াবাসীর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই সুপেয় পানির সংকট ছিল অন্যতম বড় সমস্যা। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎসগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠত। দৈনন্দিন প্রয়োজনের পানি সংগ্রহ করতে পাড়ার মানুষকে দূরের পাহাড়ি ঝিরির ওপর নির্ভর করতে হতো। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করে তা আবার উঁচু পাহাড়ের বসতিতে নিয়ে আসা ছিল স্থানীয়দের জন্য কষ্টসাধ্য একটি কাজ।
স্থানীয় নারীদের জন্য এই দুর্ভোগ ছিল আরও বেশি। তাদের ভাষ্য, আগে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার দূরের পাহাড়ি ঝিরি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হতো। পানি নিয়ে দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি পথ বেয়ে বাড়িতে ফিরতে গিয়ে তাদের শারীরিকভাবে অনেক কষ্ট করতে হতো। শুষ্ক মৌসুমে ঝিরির পানিও শুকিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ত। তখন প্রয়োজনীয় পানির জন্য স্থানীয়দের অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হতো।
স্থানীয় মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বেথেলপাড়া এলাকা পরিদর্শনকালে পাড়াবাসীর পানির সংকটের বিষয়টি জানতে পারেন এবং এর স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবান সেনা রিজিয়নের দিকনির্দেশনায় রুমা জোনের উদ্যোগে দ্রুত ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সেনাসদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় পাড়াবাসীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও তত্ত্বাবধানে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এমন একটি বৃহৎ ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
ইতোমধ্যে বেথেলপাড়ার মানুষ নতুন নির্মিত ওয়াটার রিজার্ভার থেকে পানি সংগ্রহ শুরু করেছেন। পাড়াবাসীর পাশাপাশি পথচারীরাও প্রয়োজন অনুযায়ী এখান থেকে পানি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে শুধু বসতবাড়ির দৈনন্দিন পানির চাহিদাই নয়, দুর্গম এই এলাকায় চলাচলকারী মানুষের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় একাধিক পাহাড়ি নারী জানান, আগে পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিতে যেতে হতো। ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করে আবার উঁচু পাহাড়ে উঠতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট হতো। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি শুকিয়ে গেলে পানির জন্য আরও দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এখন পাড়ার কাছেই পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হওয়ায় তাদের সেই কষ্ট অনেকটাই কমেছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
বেথেলপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক মেম্বার লাল লুঙ থাং বম বলেন, তাদের যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে পাশে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের কাছে আস্থার প্রতীক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের ফলে পাড়াবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের পানি সংকট স্থায়ীভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

রুমা উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম পাড়ায় পানি সংকট নিরসনে সাম্প্রতিক সময়েও রুমা জোনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আর্থাপাড়ায় ওয়াটার পাম্প ও জেনারেটর প্রদান, হ্যাপিহিল পাড়ায় ২ হাজার লিটার, চায়ড়াগ্র পাড়ায় ৫ হাজার লিটার এবং সালেম পাড়ায় ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক প্রদান এবং বিভিন্ন পাড়ায় ওয়াটার পয়েন্ট নির্মাণের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে পানির সহজলভ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট শুধু পানীয় জলের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহের কারণে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, নারীদের ওপর অতিরিক্ত শ্রমের চাপ তৈরি হয় এবং শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি হলে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বেথেলপাড়ার ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার ওয়াটার রিজার্ভার সেই প্রয়োজন পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বেথেলপাড়ায় ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের উদ্যোগটিও স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর রুমা জোন অধিনায়ক জানান, এলাকার মানুষের দুর্দশা ও দুর্ভোগ লাঘবে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভেদ ও বিবাদের চক্রান্ত প্রতিহত করে সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে।

বেথেলপাড়ার পানি সংকট নিরসনে নির্মিত এই জলাধার স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সহযোগিতামূলক সম্পর্কেরও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ও জীবনযাত্রার সমস্যার প্রতি নজর দিয়ে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের পানি সংগ্রহের কষ্ট কমিয়ে কাছাকাছি একটি বড় জলাধার থেকে পানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বেথেলপাড়ায় এই উদ্যোগের প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বিশেষ করে নারী ও পরিবারের সদস্যদের দূরের পাহাড়ি ঝিরিতে গিয়ে পানি সংগ্রহের প্রয়োজন কমে আসায় তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ার কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো, তা মোকাবিলায় জলাধারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এমন একটি মৌলিক সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগকে স্থানীয়রা স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, বেথেলপাড়ার মতো পাহাড়ি দুর্গম এলাকাগুলোতে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার বাস্তব সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল তৈরি হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।