গুইমারায় সহিংসতার ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াল সেনাবাহিনী

গুইমারায় সহিংসতার ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াল সেনাবাহিনী

সহিংসতার ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে গুইমারায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াল সেনাবাহিনী
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার গুইমারায় গত বছরের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে সহায়তা সামগ্রী বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ প্রদান, নিরাপত্তায় সোলার ল্যাম্প পোস্ট স্থাপন, চিকিৎসাসেবা ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে গুইমারা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া।

এ সময় সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের দোকানঘর নির্মাণে সহায়তা, চলাচলে সমস্যায় থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হুইলচেয়ার প্রদান, স্থানীয় এলাকার নিরাপত্তা ও চলাচলের পরিবেশ উন্নত করতে সোলার ল্যাম্প পোস্ট স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।

সহিংসতার ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে গুইমারায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াল সেনাবাহিনী

শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক সহায়তার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। মাসব্যাপী এসব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্নকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং তাদের কর্মমুখী করে গড়ে তোলার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে রোগীদের মধ্যে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ উদ্যোগ স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে যতক্ষণ পর্যন্ত মূলধারায় আনা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তিনি পাহাড়ের মানুষের উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত, সিন্দুকছড়ি জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নেহাত ফয়সল, লক্ষ্মীছড়ি জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খান সজিবুল ইসলাম, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মোরতোজা আলী খানসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারার রামসু বাজার এলাকায় সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। ওই ঘটনায় বাজার ও আশপাশের এলাকায় দোকান ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। ঘটনার পরপরই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল জেলা প্রশাসন।

সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় পাহাড়িরা এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করছেন। এমনকি সেসব ভিডিওতে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতেও দেখা যায়।

সহিংসতার ক্ষত মুছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে গুইমারায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াল সেনাবাহিনী

এদিকে, ঘটনার এক বছর পর সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে দোকানঘর নির্মাণে সহায়তা, চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার, নিরাপত্তায় আলোকসুবিধা, শিক্ষা উপকরণ, চিকিৎসাসেবা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মতো বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ স্থানীয় মানুষের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার সহিংসতার পর আর্থিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এ ধরনের সহায়তা বাস্তব প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া। দোকানঘর নির্মাণে সহায়তা যেমন ক্ষতিগ্রস্তদের জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে, তেমনি কারিগরি প্রশিক্ষণ তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে শিক্ষা উপকরণ ও কৃতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদান স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ—দুই বিষয়কে সমান্তরালে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার বিষয়টিও এ কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজন চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। গুইমারায় সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে নেওয়া এসব কার্যক্রম সেই বৃহত্তর প্রয়োজনের বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে সামনে এনেছে।

স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা, তরুণদের দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মতো কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হতে পারে। সেনাবাহিনীর এই সমন্বিত সহায়তা কার্যক্রম তাই শুধু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *