একক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইউপিডিএফ, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খোলার আশা

একক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইউপিডিএফ, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খোলার আশা

একক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইউপিডিএফ, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র খোলার আশা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পাল্টে যাচ্ছে সমীকরণ। একসময়ের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি সাজেক ও এর আশপাশের অঞ্চলে দিন দিন একক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপ ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। মাঠপর্যাযয়ের নানা সূত্রে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সাজেকে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও কাঙ্খিত ফল আসেনি। বরং কৌশলগতভাবে মাঠের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হচ্ছে দলটির। একসময় সাজেকের যেসব এলাকায় ইউপিডিএফের একচ্ছত্র আধিপত্য ও শক্ত অবস্থান ছিল, তার একটি বড় অংশ এখন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন অপর সশস্ত্র গ্রুপ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক সমীকরণের জেরে বেশ কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে ইউপিডিএফ। বিশেষ করে সাজেক অঞ্চলের মাচালং, উজোবাজার, নাঙ্গলমারা এবং গঙ্গারামসহ বেশ কিছু কৌশলগত এলাকা ইতিমধ্যে সংগঠনটির হাতছাড়া হয়ে গেছে। পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় বাধ্য হয়েই এসব এলাকা থেকে নিজেদের কর্মীদের গুটিয়ে নিয়েছে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাজেকে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে, যেখান থেকে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়। প্রতিটি কটেজ থেকে রুমপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। কটেজ ও রেস্তোরাঁ ছাড়াও চাঁদের গাড়ি, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে চাঁদা তোলার এই প্রক্রিয়া সাজেক নিয়ন্ত্রণের মূল কারণ।

সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্যের লড়াইয়ে সাজেকে এই সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যটন ভরা মৌসুমে ভ্রমণে বিধিনিষেধ থাকায় সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। এই আর্থিক ক্ষতি ব্যবসায়ীরা কীভাবে পুষিয়ে নেবে, তা অনিশ্চিত। ব্যবসায়ীরা এই সংকটের দ্রুত সমাধান চান।

মূলত, ইউপিডিএফের নেতৃত্বে গত ১১ অক্টোবর ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্যকারী অ্যাসোসিয়েশন’ এর ব্যানারে তিন দফা দাবিতে সাজেক সড়কে অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। এরপর প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ ৪৮ ঘণ্টা শিথিল করা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর থেকে ফের অবরোধ শুরু হয়। দুর্গাপূজা পালনের সুবিধার্থে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত শিথিলতার পর ২২ অক্টোবর থেকে লাগাতার অবরোধ শুরু হয়।

২২ অক্টোবর সাজেকে অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে নামিয়ে আনার সময় উজোবাজার এলাকায় সেনাবাহিনীর ও পর্যটকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। দফায় দফায় চলা এই অবরোধের ফলে সাজেকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২৬ অক্টোবর খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ৫টি দাবির মধ্যে ৪টিতে সমঝোতা হলেও একটি মূল দাবিতে মতপার্থক্য থাকায় আলোচনা অমীমাংসিত থেকে যায়। এরপর দৃশ্যমান কোনো সরকারি উদ্যোগ না থাকায় সাজেকের আইনশৃঙ্খলা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাজেক পর্যটন সড়ক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেমে এসেছে ধস। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অনিত্য কুমার ত্রিপুরা বলেন, গত ২১ অক্টোবর থেকে কোনো পণ্যের গাড়ি সাজেকে আসতে পারেনি, এমনকি কৃষিপণ্যও বাইরে নিতে পারেননি স্থানীয়রা। এভাবে চলতে থাকলে সাজেকে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করবে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।”

গত ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সাজেকে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাজেকের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নিতে মন্ত্রণালয়াকে সুপারিশ
করেছে কমিটি। আগামী ডিসেম্বরে কমিটির সদস্যরা তিন পার্বত্য জেলা সফর করে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে বিশেষ একটি সূত্রের দাবি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সাজেকে পর্যটক চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। অবরোধের আগে শুধু মাচালং বাজারে জেএসএসের উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে সাজেকের ২০ থেকে ২২টি গ্রামে তাদের অবস্থান রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে ইউপিডিএফের দখলকৃত এলাকা।

ইউপিডিএফ সমর্থিত একটি সূত্রের দাবি, তারা চাইলে সংঘাতে জড়াতে পারত, তবে জেএসএসের কার্যপ্রণালী এবং সাধারণ মানুষের ওপর তাদের প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতন করতেই দল এই অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের হটকারী কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছে না ইউপিডিএফ।

অন্যদিকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক ও ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী বাবু ধন চাকমা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু দাবি মেনে নেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। উল্টো সাজেক খুলে দেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। দাবি না মেনে সাজেক খুলে দিলে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী থাকবে।

জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, জেএসএসের কোনো সশস্ত্র শাখা নেই। জেএসএস সব সব সময় জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করে। চুক্তি বিরোধী সংগঠনগুলোর কারণেই পাহাড়ে আজ অশান্তি বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, সাজেক খুলে দেওয়ার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিন্ধান্ত নেওয়া হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *