অনিয়ম-অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ, জোরালো হচ্ছে পুনর্গঠনের দাবি

অনিয়ম-অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ, জোরালো হচ্ছে পুনর্গঠনের দাবি

অনিয়ম-অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ, জোরালো হচ্ছে পুনর্গঠনের দাবি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং স্বচ্ছতার সংকটের কারণে পরিষদটি এখন জনমনে আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহল দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর নতুন কাঠামো গঠনের দাবি তুলেছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর তৎকালীন সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য দায়িত্ব ত্যাগ করলে পরিষদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ৭ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জিরুনা ত্রিপুরাকে চেয়ারম্যান করে ১৪ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়।

কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, সদস্যদের অবমূল্যায়ন, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। শিক্ষক বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে ঠিকাদারদের বিল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের মতো অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই তাকে অপসারণ করা হয়। পরদিন ৮ জুলাই শেফালিকা ত্রিপুরাকে অন্তর্বর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের মতে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যার ওপর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন খাতের দায়িত্ব ন্যস্ত। কিন্তু স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব খাতে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন সরকারের কাছে জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামো গঠন ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

খাগড়াছড়ির সামাজিক ব্যক্তিত্ব বিনোদন ত্রিপুরা বলেন, বর্তমান কাঠামোয় চেয়ারম্যানের একক প্রভাব স্পষ্ট, ফলে অন্যান্য সদস্যরা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তিনি দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিষদ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

যাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ১৯৮৯ সালের পর আর কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদ গঠিত হয়নি। ফলে গণতান্ত্রিক চর্চা অনুপস্থিত রয়েছে। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল পরিষদ গঠনের দাবি জানান।

খাগড়াছড়ি জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মালেক মিন্টু বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘হাস্যকর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, দায়িত্বে থাকা অনেকেরই জনসম্পৃক্ততা নেই এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন কার্যক্রমও অনুপস্থিত। বরং প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি জসিমউদ্দীন মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গঠন না হলে দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি দেশের অন্যান্য জেলার মতো পার্বত্য জেলাগুলোতেও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পরিষদ গঠনের ওপর জোর দেন।

সুজনের সভাপতি নাসির উদ্দীন আহমেদ বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ শুধু উন্নয়ন নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদ গঠন করা হলে জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার বলেন, পার্বত্য চুক্তির পর বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম জেলা পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এর কার্যকর থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য পরিষদ গঠন করা হলে জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নতুন কাঠামোতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।