পাজেপ চেয়ারম্যান হতেই কি তবে চাকরি ছাড়লেন ম্রাসাথোয়াই?
ম্রাসাথোয়াই মারমা
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক ম্রাসাথোয়াই মারমার স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার ঘটনাটি এখন আর নিছক একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলে মনে করার সুযোগ নেই। বরং এটি ক্রমেই একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে—পাজেপ চেয়ারম্যান হওয়ার লক্ষ্যেই কি তিনি সময়মতো চাকরি ছাড়লেন?
এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানে দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—এই তিন জেলায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষমতাসীন দল দ্বারা মনোনয়ন দেওয়া হয়, যা মূলত কেন্দ্র থেকে পাঠানো ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। ফলে এখানে নির্বাচন নয়, বরং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কেন্দ্রীয় সমর্থনই মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
এই বাস্তবতায় ম্রাসাথোয়াই মারমার স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ বলেই প্রতীয়মান হয়। স্থানীয়ভাবে আগে থেকেই তার চেয়ারম্যান হওয়ার আগ্রহ ও তৎপরতার কথা আলোচনায় ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চাকরি থেকে সরে দাঁড়ানো যেন পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ, তদন্তের আবেদন
বাংলাদেশের চাকরিবিধি অনুযায়ী, একজন কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী কোনো রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। এমনকি সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাকে আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, স্বেচ্ছা অবসর নেওয়া তার জন্য একটি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ মাত্র। অর্থাৎ, চাকরিতে থাকলে চেয়ারম্যান হওয়ার পথ বন্ধ থাকত—অবসর সেই পথ খুলে দিয়েছে।
তবে এখানেই প্রশ্নের শেষ নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—চাকরি ছাড়লেই কি তিনি নৈতিকভাবে চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠলেন?
ম্রাসাথোয়াই মারমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়। দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন, আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পত্তি নিবন্ধন, চাকরি দেওয়ার নামে ঘুষ গ্রহণ—এসব অভিযোগ যদি সামান্য অংশেও সত্য হয়, তাহলে তা একটি গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে। এমন অবস্থায় তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অবসরের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াটি আড়ালে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আরেকটি দিক আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে—পার্বত্য জেলা পরিষদে যেহেতু নির্বাচন হয় না, বরং মনোনয়নের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়, তাই এখানে প্রার্থীর নৈতিকতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিতর্কমুক্ত থাকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। কারণ জনগণের সরাসরি ভোটের যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ এখানে অনুপস্থিত।
দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক ম্রাসাথোয়াই মারমার স্বেচ্ছা অবসর
কিন্তু বাস্তবতা কি সে কথাই বলছে?
একজন বিতর্কিত সরকারি কর্মচারী, যার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তিনি যদি স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে যান, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়—বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তিনি স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধাও পাচ্ছেন—ল্যাম্পগ্র্যান্ট ও আনুতোষিকসহ। অর্থাৎ, একদিকে অভিযোগের ভার বহন করছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন—এই দ্বৈত বাস্তবতা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে।
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—পাজেপ চেয়ারম্যান হতেই কি তবে এই সময়োচিত অবসর?
আইন হয়তো তাকে সেই সুযোগ করে দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকতা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থের প্রশ্নে বিষয়টি এত সহজ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অপরিহার্য। সেখানে বিতর্কিত অতীতকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা—এটি কেবল একজন ব্যক্তির বিষয় নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।
এখন দেখার বিষয়—কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তারা কি এসব প্রশ্ন বিবেচনায় নেবে, নাকি পুরনো ধারা অব্যাহত থাকবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।