দুর্গম মদকে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব, বিপদের সময় মানুষের পাশে বিজিবি
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বান্দরবানের দুর্গম ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদ থানচি উপজেলার মদকে আকস্মিক ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সীমিত সুযোগের মধ্যে একের পর এক মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বিজিবির আলীকদম ব্যাটালিয়ন (৫৭ বিজিবি) দুর্গম এলাকায় গিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা, বিনামূল্যে ওষুধ, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে।
৫৭ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে মদক বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মদক ভিতরপাড়া গ্রামে থুই মা চিং মার্মা (৪২) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একই এলাকায় আরও ১০ থেকে ১৫ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পায় বিজিবি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার এই আকস্মিক পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা না পৌঁছালে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

খবর পাওয়ার পরপরই মদক বিওপির ব্যবস্থাপনায় বিজিবির একটি টহল দল ও মেডিকেল সহকারী প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অসুস্থ ব্যক্তিদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় দুর্গম এলাকার আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা আরও নিশ্চিত করতে বিজিবির উদ্যোগে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের একটি মেডিকেল টিমও ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। এর ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চিকিৎসাসেবার বাইরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা রোগীদের কাছেই চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

ডায়রিয়ার প্রকোপ অব্যাহত থাকায় ২০ সেপ্টেম্বর আলীকদম ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের দিকনির্দেশনায় মেডিকেল অফিসারের নেতৃত্বে পুনরায় চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ সময় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ও অসহায় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করা হয়।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এমন স্বাস্থ্যঝুঁকির সময়ে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া স্থানীয়দের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ মদকের মতো সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সংকটের মুহূর্তে স্থানীয় পর্যায়েই চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ আক্রান্তদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী বিতরণও দুর্গত মানুষের জন্য বাড়তি সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় বিজিবির চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রেখেছে।
চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় পাড়া কারবারী/হেডম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিজিবি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে আক্রান্ত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে দায়িত্বপূর্ণ অন্যান্য এলাকাতেও মেডিকেল ক্যাম্প ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের কল্যাণে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীটি।

স্থানীয়দের জন্যও বিপদের সময়ে এ ধরনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বের বাইরে স্থানীয় মানুষের জরুরি প্রয়োজন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ পার্বত্য দুর্গম এলাকার জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে যেখানে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দ্রুত সরকারি সেবা পৌঁছানো কঠিন, সেখানে বিজিবির মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক সাড়া মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
বিজিবির কর্মকর্তারা বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি এসব কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখবে। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি জনকল্যাণ ও মানবিক সহায়তায় বিজিবির এমন উদ্যোগ দুর্গম পাহাড়ি জনপদে মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।