কমল বিকাশ চাকমার অসহায়ত্বের খবর পৌঁছাল সেনাবাহিনীর কানে, মানবিকতার হাত বাড়াল গুইমারা রিজিয়ন

কমল বিকাশ চাকমার অসহায়ত্বের খবর পৌঁছাল সেনাবাহিনীর কানে, মানবিকতার হাত বাড়াল গুইমারা রিজিয়ন

কমল বিকাশ চাকমার অসহায়ত্বের খবর পৌঁছাল সেনাবাহিনীর কানে, মানবিকতার হাত বাড়াল গুইমারা রিজিয়ন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

অসুস্থতা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা আর দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটে যখন জীবন অনেকটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সহায়তা চেয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সাংবাদিক কমল বিকাশ চাকমা। পরে লোকলজ্জার কথা ভেবে পোস্টটি মুছে ফেলেন। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁর সেই সাময়িক আর্তি পৌঁছে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়নের সেনা কর্মকর্তাদের কাছে। এরপর যে ঘটনা ঘটেছে, তা তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে পাহাড়ে নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আরেকটি মানবিক দৃষ্টান্ত।

আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে কমল বিকাশ চাকমা জানান, ইদানীং তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না। দুই চোখে ছানি পড়েছে, চোখ মেলতেও কষ্ট হয়। এর পাশাপাশি ডিস্টোনিয়া রোগের সমস্যাও বেড়েছে। বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে জানান তিনি।

তিনি লেখেন, ২০২২ সাল থেকে ডিস্টোনিয়া রোগের নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারছেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি চার থেকে ছয় মাস অন্তর ইনজেকশন নেওয়ার কথা থাকলেও গত প্রায় চার বছর ধরে তা সম্ভব হয়নি। একবার ইনজেকশন নিতে প্রায় তিন লাখ টাকার বেশি প্রয়োজন হওয়ায় আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

এ অবস্থায় গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় এক ঘণ্টার জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা চেয়ে একটি পোস্ট দেন কমল বিকাশ চাকমা। নিজের ভাষায়, ‘লোকলজ্জা বাদ দিয়ে’ সহায়তা চেয়েছিলেন তিনি। তবে পরে পোস্টটি মুছে দেন। তাঁর ধারণা ছিল, দীর্ঘদিনের পরিচিত বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও মানুষের দোয়া-আশীর্বাদই হয়তো তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে।

কিন্তু পোস্টটি মুছে ফেলার পরও বিষয়টি আর আড়ালে থাকেনি। কমল বিকাশ চাকমা জানান, ওই স্বল্প সময়ের পোস্টটি গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডারের নজরে আসে। তাঁর মোবাইল নম্বরও সংরক্ষিত ছিল রিজিয়ন কমান্ডারের কাছে। গতকাল সন্ধ্যার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। সৌজন্যমূলক কথোপকথন হলেও ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি।

আজ সকালে কমল বিকাশ চাকমা ওই নম্বরে ফোন করলে তাঁকে গুইমারা রিজিয়নে গিয়ে এক কাপ চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে তিনি গুইমারা রিজিয়নে পৌঁছান। পরে তাঁকে রিজিয়নের স্টাফ অফিসারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলাপচারিতা হয়।

কমল বিকাশ চাকমার বর্ণনা অনুযায়ী, আলাপের একপর্যায়ে তাঁর কৌতূহলেরও অবসান ঘটে। তিনি জানতে পারেন, আগের সন্ধ্যায় যে কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করেছিলেন, তিনি গুইমারা রিজিয়নের সেই স্টাফ অফিসারই। আর রিজিয়ন কমান্ডারের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরেই তাঁকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রিজিয়ন কমান্ডার একসময় দীঘিনালা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন এবং সে সময় তাঁর সঙ্গে কমল বিকাশ চাকমার সাক্ষাৎ হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কমল বিকাশ চাকমা গুইমারা রিজিয়নের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রাণবন্ত ও আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন। ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়াও আলাপচারিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা ও মতবিনিময় হয়।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পরস্পরের শুভকামনা বিনিময় করে তিনি গন্তব্যের উদ্দেশে গুইমারা রিজিয়ন ত্যাগ করেন। তবে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের সময়ে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এ মানবিক যোগাযোগের বিষয়টি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা, দুর্যোগ কিংবা ব্যক্তিগত সংকট—বিভিন্ন প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা নতুন নয়। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রীয় সেবার অনেক সুযোগ সীমিত থাকায় স্থানীয় মানুষের জন্য যে কোনো জরুরি সময়ে দ্রুত সহায়তা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতায় কোনো প্রচার বা আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা না করে একজন মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক আবেদন নজরে নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং কথা বলার ঘটনাটি মানবিক সহায়তার একটি ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরেছে।

কমল বিকাশ চাকমার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর জনসম্পৃক্ততার একটি দিক। নিরাপত্তা দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় দুর্গম এলাকার মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও জোনের কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বা ব্যক্তি সংকটে পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কোথাও সহায়তার সুযোগ পান না, তাদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের আনাচেকানাচে এমন অসংখ্য পরিবারের গল্প রয়েছে, যাদের কঠিন সময়ে কোনো না কোনোভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে সেনাবাহিনী। কখনো চিকিৎসার ব্যবস্থা, কখনো ঘর নির্মাণ বা মেরামতের উপকরণ, কখনো শিক্ষা সহায়তা, আবার কখনো কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কিংবা জরুরি খাদ্য সহায়তা—এভাবেই নিরবে-নিভৃতে মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে বাহিনীটি। কমল বিকাশ চাকমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সেই ধারাবাহিকতার একটি মানবিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।

নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসের শেষাংশে কমল বিকাশ চাকমা যেভাবে ঘটনাটি তুলে ধরেছেন, তাতে ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও তাঁর অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি আন্তরিক যোগাযোগের বিষয়টি। আর সেই অভিজ্ঞতা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে—পাহাড়ের দুর্গম জনপদে শত শত পাহাড়ি পরিবারের কাছে কঠিন সময়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ এখনো এক ধরনের ভরসার জায়গা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *