গুইমারায় ৪৫০ অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিল সেনাবাহিনীর সিন্দুকছড়ি জোন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে খাগড়াছড়ির গুইমারায় বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়নের অধীন সিন্দুকছড়ি জোন। দিনব্যাপী এ ক্যাম্পে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল দলের মাধ্যমে প্রায় ৪৫০ জন দরিদ্র ও অসহায় পাহাড়ি-বাঙালি রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া অনেকের জন্যই কঠিন, সেখানে এমন উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য সরাসরি ও তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি করেছে।
মেডিকেল ক্যাম্পে জ্বর, সর্দি-কাশি, চক্ষুজনিত সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, চর্মরোগসহ বিভিন্ন মৌসুমি অসুস্থতার চিকিৎসা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপও কমেছে।
পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুর্গমতা একটি বড় বাস্তবতা। অনেক প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এর সঙ্গে যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ যুক্ত হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে আয়োজিত এমন মেডিকেল ক্যাম্প সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে স্থানীয় জনগণের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

এ কর্মসূচির বিশেষ দিক ছিল সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে সম্প্রতি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থানীয় নার্সদের একটি দলকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সম্পৃক্ত করা। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তাঁরা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের সহযোগিতা করেন। এর ফলে শুধু একটি দিনের চিকিৎসাসেবা নয়, স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগও দেখা গেছে
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বলেন, সিন্দুকছড়ি জোনের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকার তরুণীদের চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মেডিকেল সরঞ্জাম দেওয়ার ফলে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় পর্যায়েই প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা তৈরিতে এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্বও রয়েছে। প্রশিক্ষিত স্থানীয় নারীরা ভবিষ্যতে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করতে পারবেন। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে এমন প্রশিক্ষিত জনবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ পেয়ে গুইমারা এলাকার সুবিধাভোগী সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সিন্দুকছড়ি জোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। তাই প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এ ধরনের উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা নয়, জনকল্যাণ ও মানবিক দায়িত্ব পালনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
সিন্দুকছড়ি জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেই নিয়মিতভাবে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একটি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সুযোগ তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, এরই ধারাবাহিকতায় কিছুদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম লায়ন্স হসপিটালের সহযোগিতায় একই স্থানে একটি ‘বিনামূল্যে চক্ষু ক্যাম্পেইন’ আয়োজন করা হবে। পরবর্তীতে আরও বড় পরিসরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অংশগ্রহণে পুনরায় ‘মেডিকেল ক্যাম্পেইন’ পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পাহাড়ের দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা শুধু চিকিৎসা দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো। সিন্দুকছড়ি জোনের এ ধরনের উদ্যোগ এসব ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করার সুযোগ তৈরি করছে।
শান্তি, সম্প্রীতি ও জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের পাশে থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ধারাবাহিকতায় এ মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এলাকার মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সিন্দুকছড়ি জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।