শুভলং ঘিরে পর্যটন মহাপরিকল্পনার দাবি, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

শুভলং ঘিরে পর্যটন মহাপরিকল্পনার দাবি, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

শুভলং ঘিরে পর্যটন মহাপরিকল্পনার দাবি, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পাহাড়, নীল জলরাশি আর ঝরনার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা রাঙামাটির বরকল উপজেলা। কাপ্তাই হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি ও শুভলং ঝরনাসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এ অঞ্চলে পর্যটনশিল্প বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও পরিকল্পিত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত পর্যটন অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে না ওঠায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় শুভলং ঝরনাকে কেন্দ্র করে বরকলের পর্যটন খাতের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের মতে, শুভলংকে কেন্দ্র করে আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে শুধু দেশীয় পর্যটক নয়, বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বরকলকে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। এজন্য কেবল কার, পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট, আধুনিক গেস্ট হাউস, পর্যটনকেন্দ্রিক খাবারের ব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযোগাযোগ, পর্যটন গাইড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে সড়ক ও নৌপথের মাধ্যমে নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনারও দাবি রয়েছে।

কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি ও পাহাড়ের মধ্যে শুভলং ঝরনার অবস্থান এ অঞ্চলের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষা মৌসুমে ঝরনায় পানির প্রবাহ বাড়লে এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বরকলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় ঝরনা ও প্রাকৃতিক স্থানগুলোকে একটি পর্যটন নেটওয়ার্কের আওতায় আনা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে শুধু একটি নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্র নয়, পুরো উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সুবিমল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে। রাঙামাটির পর্যটনশিল্পের উন্নয়নেও পরিকল্পনা রয়েছে। বরকলে ছোট-বড় অসংখ্য ঝরনা রয়েছে, এর মধ্যে শাখরা ছড়ি ঝরনা অন্যতম। ইকো-ট্যুরিজম ও পর্যটন গাইড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আগামী বাজেটে পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপু তালুকদারকে জানানো হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরকলের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় পর্যটনকেন্দ্র হবে, কোথায় আবাসন ও বিনোদনসুবিধা গড়ে উঠবে, কীভাবে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে এবং কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হবে—এসব বিষয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক নৌপর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নৌযান চলাচলে নিরাপত্তা ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পিত পর্যটনশিল্প গড়ে উঠলে বরকলের স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পর্যটকদের থাকার জন্য হোটেল, গেস্ট হাউস ও ইকো-রিসোর্ট গড়ে উঠলে সেখানে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, নৌপরিবহন, পর্যটক গাইড, স্থানীয় পরিবহন, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডেও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় শিক্ষিত বেকার যুবকদের পর্যটন গাইড, ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্ত করা গেলে তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে।

পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উৎপাদিত কৃষিপণ্য, ফলমূল, পাহাড়ি পণ্য ও হস্তশিল্পের বাজারও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পর্যটকদের কাছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী খাবার তুলে ধরতে পারলে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন বাজার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে পর্যটনশিল্পের সুফল শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে। পাহাড় কাটা, বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং কাপ্তাই হ্রদের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর যাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়, সেদিকে নজর রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রকৃতিই বরকলের পর্যটনের প্রধান সম্পদ। তাই সেই প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অবকাঠামো তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের সম্ভাবনাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে শুভলংকে কেন্দ্র করে বরকলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পরিকল্পনার আওতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ, নিরাপদ যোগাযোগ, পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বরকলের পর্যটন খাত আরও বিকশিত হতে পারে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বরকলের পর্যটন সম্ভাবনা শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন হলে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আয়ের পথও তৈরি হতে পারে।

তাদের প্রত্যাশা, শুভলং ঝরনাকে কেন্দ্র করে কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং কাপ্তাই হ্রদ, ঝরনা, পাহাড় ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকো-ট্যুরিজম অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এতে একদিকে বরকলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও পরিচিত হবে, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়ে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *