ক্যান্সার আক্রান্ত অমরধন চাকমাকে নতুন জীবন দিল সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন

ক্যান্সার আক্রান্ত অমরধন চাকমাকে নতুন জীবন দিল সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন

অহিংসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধেই প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ৩৭ বিজিবির অধিনায়ক https://southeast-asiajournal.com/archives/116092
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (২৬ ইসিবি)। অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যান্সার আক্রান্ত এক পাহাড়ি ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছে সেনাবাহিনীর এ ইউনিট। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পরিচর্যা শেষে বর্তমানে সুস্থ হয়ে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম থুমপাড়া এলাকার বাসিন্দা অমরধন চাকমা।

ঘটনাটি শুধু একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দুর্গম পাহাড়ে মানুষের সংকট ও অসহায়ত্বের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। একসময় অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে না পারা অমরধন চাকমা ও তাঁর পরিবারের কাছে সুস্থ জীবনে ফেরার আশা প্রায় নিভে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ২৬ ইসিবির উদ্যোগ তাঁদের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করে।

জানা যায়, বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম থুমপাড়া এলাকার বাসিন্দা অমরধন চাকমা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রথম দিকে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রোগের জটিলতা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে একপর্যায়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর চিকিৎসা। প্রিয়জনের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। একদিকে অসুস্থ স্বজনকে হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে না পারার অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে পরিবারটির দিন কাটছিল চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায়। তাঁদের এই কষ্ট ও অসহায়ত্ব প্রতিবেশীদের মধ্যেও বেদনার সৃষ্টি করে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি পৌঁছে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের কাছে। খবর পাওয়ার পর মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দ্রুত অমরধন চাকমার খোঁজখবর নিতে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী। তাঁর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি সরেজমিনে জানার পর ২৬ ইসিবির অধিনায়ক তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে অমরধন চাকমার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তাঁকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। শুধু হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেই দায়িত্ব শেষ করেনি সেনাবাহিনী; বরং তাঁর জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে ২৬ ইসিবি। ফলে অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে অমরধন চাকমা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার সুযোগ পান।

সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতা, চিকিৎসা ও পরিচর্যায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন অমরধন চাকমা। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কাটিয়ে বর্তমানে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। যে পরিবারটি একসময় প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, সেই পরিবারে ফিরে এসেছে স্বস্তি, আনন্দ ও নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ২৬ ইসিবি যে মানবিক সহযোগিতার পরিচয় দিয়েছে, তা স্থানীয় মানুষের কাছেও প্রশংসিত হচ্ছে।

সেনাবাহিনীর এমন সহযোগিতায় আবেগাপ্লুত অমরধন চাকমা ও তাঁর স্ত্রী। নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁরা বলেন, “যখন বাঁচার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের সহযোগিতা না পেলে হয়তো আজকের এই দিনটি দেখা হতো না। এই ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়।”

তাঁরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ২৬ ইসিবির অধিনায়কসহ এ মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল সদস্যের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁদের কাছে সেনাবাহিনীর এই সহায়তা শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং কঠিন সময়ে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার এক স্মরণীয় অধ্যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর যে দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬ ইসিবি স্থাপন করেছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়া একজন ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করা মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।

দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একজন অসুস্থ মানুষের জীবনেই আশার আলো জ্বালায়নি, বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যেও আস্থা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখছে। মানুষের সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, অসহায় পরিবারের কষ্ট লাঘব করা এবং জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান—এসব উদ্যোগই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে।

অমরধন চাকমার সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসা তাই ২৬ ইসিবির মানবিক সহযোগিতার একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। দুর্গম পাহাড়ে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানুষের জীবন রক্ষায় সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের জন্য আশার বার্তা হয়ে থাকবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed